ছোট ভাইবোন ও অভিভাবকবৃন্দ, এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর এখন আপনাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—একাদশ শ্রেণিতে (এইচএসসি) ভর্তি। ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণির ভর্তি প্রক্রিয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ আন্তঃ শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম, সময়সূচী ও ফি কাঠামো নির্ধারণ করেছে। আপনি যদি কোনো ভুলভ্রান্তি ছাড়া সহজেই আবেদন সম্পন্ন করতে চান, তবে নীতিমালার প্রতিটি টেকনিক্যাল বিষয় জানা অত্যন্ত জরুরি। একজন অভিজ্ঞ বড় ভাই হিসেবে এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার সঠিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য তুলে ধরছি, যাতে আবেদনের সময় কোনো জটিলতায় পড়তে না হয়।
একাদশ শ্রেণি ভর্তি ২০২৬-এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
বাংলাদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত "একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির নীতিমালা-২০২৬" অনুযায়ী, দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি কলেজ, সমমানের মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি সম্পন্ন হবে। কোনো কলেজ নিজ দায়িত্বে অফলাইনে সরাসরি ফরম বিক্রি বা ভর্তি গ্রহণ করতে পারবে না।
- আবেদনের প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট: xiclassadmissions.gov.bd
- আবেদনের মাধ্যম: শুধুমাত্র অনলাইন (ম্যানুয়াল ফরম বিতরণ সম্পূর্ণ বন্ধ)।
- পছন্দক্রম সীমা: একজন শিক্ষার্থী সর্বনিম্ন ৫টি এবং সর্বোচ্চ ১০টি কলেজ পছন্দ দিতে পারবে।
- আবেদন ফি: ২২০/- টাকা (অনলাইন আবেদনের জন্য সরকার নির্ধারিত)।
- প্রাথমিক নিশ্চয়ন ফি: ৩৪০/- টাকা (মনোনীত কলেজে সিট কনফার্মেশনের জন্য)।
ভর্তির যোগ্যতা ও গ্রুপ নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মাবলী
২০২৪, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে দেশের যেকোনো শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা বোর্ড, কারিগরি বোর্ড বা বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা এবার অনলাইনে আবেদন করতে পারবে। এছাড়া বিদেশ থেকে সমমানের ডিগ্রি নিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে সনদের মান নির্ধারণের (Equivalence) পর আবেদনের সুযোগ পাবে।
গ্রুপ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নীতিমালার ২.৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিচের নিয়মগুলো কঠোরভাবে প্রযোজ্য:
- বিজ্ঞান বিভাগ: বিজ্ঞান থেকে উত্তীর্ণ প্রার্থীরা বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা, ইসলামী শিক্ষা, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বা সংগীত বিভাগের যেকোনোটিতে আবেদন করতে পারবে।
- মানবিক বিভাগ: মানবিক থেকে উত্তীর্ণরা মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা, ইসলামী শিক্ষা, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বা সংগীত বিভাগে আবেদন করতে পারবে।
- ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ: ব্যবসায় শিক্ষার প্রার্থীরা ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিক, ইসলামী শিক্ষা, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বা সংগীত বিভাগ নির্বাচন করতে পারবে।
- মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ড: ভোকেশনাল ও দাখিল শিক্ষার্থীরা তাদের অর্জিত যোগ্যতা ও স্ট্রিম অনুযায়ী সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদিত কলেজেও আবেদন করতে পারবে।
বিশেষ সতর্কতা: নীতিমালা অনুযায়ী, বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অন্য যেকোনো বিভাগে পরিবর্তিত হওয়া যাবে, কিন্তু পরবর্তীতে কোনো অবস্থাতেই বিজ্ঞান বিভাগে ফিরে আসার সুযোগ নেই। আবার অন্যান্য বিভাগ থেকে এসে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ারও কোনো নিয়ম রাখা হয়নি।
একাদশ শ্রেণি ভর্তি ২০২৬: অফিশিয়াল সময়সূচী
ভর্তি সংক্রান্ত নীতিমালার নীতি ৬.০ অনুযায়ী বাংলাদেশ আন্তঃ শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত মূল তারিখ ও শিডিউল নিচে ছক আকারে তুলে ধরা হলো:
|
ক্রমিক |
ভর্তি সংক্রান্ত কার্যক্রম |
সময়সীমা ও তারিখ |
|---|---|---|
|
১ |
অনলাইনে প্রাথমিক আবেদন গ্রহণ |
|
|
২ |
পুনঃনিরীক্ষণে ফল পরিবর্তিতদের আবেদন |
আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই ও সংশোধনের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত আটটার মধ্যে |
|
৩ |
পছন্দক্রম পরিবর্তনের সময়সূচী |
শিক্ষার্থী বাছাইয়ের পর প্রথম পর্যায়ের প্রাথমিক নিশ্চয়ন ও ফি প্রদান প্রক্রিয়া চালু থাকবে ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রবিবার থেকে পরবর্তী ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার অবধি। |
|
৪ |
প্রথম ধাপের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ |
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (বুধবার রাত ৮:০০ টা) |
|
৫ |
প্রাথমিক নির্বাচন নিশ্চয়ন (শিক্ষার্থী কর্তৃক) |
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (শুক্রবার রাত ৮:০০ টা পর্যন্ত) |
|
৬ |
পছন্দক্রম অনুযায়ী অটো-মাইগ্রেশনের ফল প্রকাশ |
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (শনিবার রাত ৮:০০ টা) |
|
৭ |
নিজ নিজ কলেজে গিয়ে চূড়ান্ত ভর্তি প্রক্রিয়া |
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (রবিবার) থেকে ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (মঙ্গলবার) |
|
৮ |
সারাদেশে একযোগে একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু |
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (বুধবার) |
প্রার্থী নির্বাচন নীতি ও মেধা তালিকা নির্ধারণ পদ্ধতি
একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী নির্বাচনের জন্য কোনো প্রকার পৃথক ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না। শিক্ষার্থীদের অর্জিত এসএসসি/সমমান পরীক্ষার জিপিএ এবং প্রাপ্ত মোট নম্বরের ভিত্তিতেই স্বয়ংশাসিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে পছন্দক্রম অনুসারে কলেজ বরাদ্দ দেওয়া হবে।
সমান জিপিএ বা নম্বর প্রাপ্তদের ক্ষেত্রে টাই-ব্রেকিং নিয়ম:
- সমান জিপিএ প্রাপ্তদের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সর্বমোট প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনায় আনা হবে।
- বিজ্ঞান বিভাগের ক্ষেত্রে জিপিএ এবং মোট নম্বর এক হলে পর্যায়ক্রমে সাধারণ গণিত, উচ্চতর গণিত/জীববিজ্ঞান, ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে প্রাপ্ত নম্বর দেখা হবে।
- মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের জটিলতা নিরসনে পর্যায়ক্রমে ইংরেজি, গণিত ও বাংলা বিষয়ের নম্বর বিবেচনায় নেওয়া হবে।
- স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভর্তির সুযোগ পাবে।
কোটা ব্যবস্থা (২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য):
নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো কলেজের মোট আসনের ৯৩% সকলের জন্য মেধার ভিত্তিতে উন্মুক্ত থাকবে। সংরক্ষিত আসনে মুক্তিযোদ্ধা/শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য ৫% এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ দপ্তর/সংস্থায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য মোট ২% আসন সংরক্ষিত থাকবে। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী না পাওয়া গেলে মেধা তালিকা থেকে আসনগুলো পূরণ করা হবে।
অনলাইন আবেদন ফি ও বিভিন্ন সেশন চার্জের বিস্তারিত হিসাব
ভর্তি আবেদনের জন্য নির্ধারিত ফি এবং নির্বাচিত কলেজে চূড়ান্ত ভর্তির ফি সংক্রান্ত অফিশিয়াল তালিকা নিচে প্রকাশ করা হলো:
- অনলাইন আবেদন ফি: ২২০/- টাকা।
- প্রাথমিক নিশ্চয়ন ফি: বোর্ড ফি, রেজিস্ট্রেশন, ক্রীড়া, রোভার/রেঞ্জার, রেড ক্রিসেন্ট, বিএনসিসি ও অন্যান্য তহবিল বাবদ সর্বমোট ৩৪০/- টাকা বোর্ড নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক পেমেন্ট গেটওয়েতে জমা দিতে হবে।
এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও সেশন চার্জ (সর্বোচ্চ সীমা):
- ঢাকা মেট্রোপলিটন শহরগুলোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সেশন চার্জ সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা (বাংলা মাধ্যম) এবং এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য তা নির্ধারিত সীমা অনুযায়ী প্রযোজ্য।
- অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকা: ৩,০০০/- টাকা
- জেলা সদর এলাকা: ২,০০০/- টাকা
- উপজেলা/মফস্বল এলাকা: ১,৫০০/- টাকা
নন-এমপিও বা আংশিক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ভর্তি ও সেশন চার্জ:
- ঢাকা শহরের আংশিক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে বাংলা মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৭,৫০০ টাকা এবং ইংরেজি ভার্সনের ক্ষেত্রে ৮,৫০০ টাকা চার্জ প্রযোজ্য হবে।
- অন্যান্য মেট্রোপলিটন: বাংলা ভার্সন ৫,০০০/- টাকা; ইংরেজি ভার্সন ৬,০০০/- টাকা।
- জেলা এলাকা: বাংলা ভার্সন ৩,০০০/- টাকা; ইংরেজি ভার্সন ৪,০০০/- টাকা।
- উপজেলা/মফস্বল: বাংলা ভার্সন ২,৫০০/- টাকা; ইংরেজি ভার্সন ৩,০০০/- টাকা।
ধাপে ধাপে অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে আবেদনের সঠিক উপায়
১. ফি পরিশোধ: যেকোনো অনুমোদিত পেমেন্ট গেটওয়ে (বিকাশ, নগদ, রকেট, সোনালিসেবা ইত্যাদি) নির্বাচন করে আপনার এসএসসি রোল, পাসের বছর, বোর্ড ও মোবাইল নম্বর ইনপুট দিয়ে ২২০/- টাকা ফি জমা দিন।
২. পোর্টালে লগইন: সরাসরি xiclassadmissions.gov.bd ঠিকানায় প্রবেশ করে "Apply Online" বাটনে চাপ দিন।
৩. তথ্য ইনপুট: রোল নম্বর, পাসের সন, বোর্ড ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিলে সিস্টেমে আপনার নাম ও ফলাফল প্রদর্শন করবে।
৪. যোগাযোগ ও নিরাপত্তা: আপনার ব্যবহৃত নিজস্ব সচল মোবাইল নম্বর দিন। প্রক্রিয়াটির পরবর্তী নিরাপত্তার জন্য এই নম্বর এবং প্রাপ্ত সিকিউরিটি কোডটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫. কলেজ নির্বাচন: ন্যূনতম ৫টি এবং সর্বোচ্চ ১০টি কলেজ পছন্দ করুন। প্রতিটি কলেজের শিফট, ভার্সন ও গ্রুপ সতর্কতার সাথে সিলেক্ট করুন।
৬. আবেদন জমা: পছন্দের তালিকা রি-চেক করে "Submit Application" বাটনে ক্লিক করুন এবং কনফার্মেশন স্লিপটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য ডাউনলোড/প্রিন্ট করে রাখুন।
অটো-মাইগ্রেশন ও সিকিউরিটি কোড সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
প্রথম ধাপে কলেজ বরাদ্দের পর প্রাপ্ত ফল পছন্দ হলে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৩৪০/- টাকা নিশ্চয়ন ফি দিয়ে সিট কনফার্ম করতে হবে। কেউ সময়মতো নিশ্চয়ন না করলে তার মেধা নির্বাচন এবং মূল আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। নিশ্চয়ন করার পর অটো-মাইগ্রেশন সুবিধা চালু থাকে, যা আপনার পছন্দের নিম্নক্রমের কলেজ থেকে খালি আসন সাপেক্ষে ওপরের পছন্দের কলেজের দিকে অটোমেটিক স্থানান্তরিত করবে। কখনো ওপরের পছন্দ থেকে নিচের পছন্দের দিকে মাইগ্রেশন ঘটে না।
ভর্তি প্রক্রিয়া চলাকালীন শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রদত্ত সিকিউরিটি কোড ও পিন নম্বর যত্নসহকারে সংরক্ষণ করতে হবে। নিশ্চয়ন বাতিল, মাইগ্রেশন আপডেট কিংবা চূড়ান্ত ভর্তির সময় প্রতিটি পদক্ষেপে এই কোডটির দরকার হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য:
এই আর্টিকেলে উল্লেখিত সকল তারিখ, ফি ও ভর্তি সংক্রান্ত নিয়মাবলী শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ আন্তঃ শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি কর্তৃক জারিকৃত অফিশিয়াল "একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির নীতিমালা-২০২৬" অনুসরণ করে প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় নীতিমালার সময়সূচী বা শর্তাবলীতে সংশোধন আনলে তার দায় আমাদের নয়। ভর্তি ইচ্ছুক সকল শিক্ষার্থীকে আবেদন সম্পন্ন করার পূর্বে অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ সার্কুলার ও নোটিশটি যাচাই করে নেওয়ার জন্য বিশেষভাব পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন